দৈনিক শিক্ষা খবর

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষায়,সময়সূচি বড় অন্তরায়..!

এম.এ মারুফ সোহেল,শিক্ষক ও কলামিষ্ট: শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। এটা পুরনো কথা হলেও এটা যেমন সত্য।আবার জাতি গঠনের প্রাক- প্রস্তুতির মূলে রয়েছে প্রাথমিকের শিক্ষকদের বিশাল অবদান।এই অবদানকে ফলপ্রসু ও কার্যকর করার জন্য প্রাথমিকের শিক্ষকদের চাওয়া পাওয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শণ করা এখন সময়েন দাবী।পাশাপাশি প্রাথমিক স্তর শুরু হয় কোমলমতি শিশুদের দিয়ে,যাদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনা করাটারও এখন সময়। কেননা,প্রাথমিক স্তরের অধিকাংশ শিশুই দু’বেলা দু’মুঠো পুষ্টিকর খাবার ঠিকমত পায়না অথচ সে সকল শিশুদেরকেই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কখনও অনাহারে কখনও বা অর্ধাহারে অথবা পান্তা ভাত খেয়ে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। বিদ্যালয় শেষে বাড়ি ফিরতে সময় লাগে প্রায় সন্ধ্যা (বিশেষ করে শীতকালে)। এতো দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করা শিশুদের পক্ষে যেমন অত্যন্ত কষ্টকর তেমনি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্তরায়। এদিকে,সারাদেশে হাজিরা মেশিন কেনার প্রক্রিয়া চলমান,আবার কোথাও কোথাও অলরেডি ডিজিটাল হাজিরা মেশিনে শুরু হয়ে গেছে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে আগমন-প্রস্থানের কাজ। হয়তো ২০২০ সালের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হবে। প্রশ্ন হচ্ছে যাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এতসব আয়োজন;সেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে ডিজিটাল মেশিন চালু করার আগে সারা বাংলাদেশের সকল শিক্ষক শিক্ষকের একটা আকুল আকুতি প্রকাশ পাচ্ছে যে বিদ্যালয় সময়সূচি ১০.০০ টা থেকে ৩.০০ টা করলে হয়তো নিশ্চিন্ত মনে বিদ্যালয়ের কাজে যোগ দিতে পারবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে দীর্ঘদিন যাবত হাজার হাজার শিক্ষক এই মত প্রকাশ করছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, উল্লেখিত সময় সূচিই আসলেই সঠিক সময়। বিকাল ৩টা বাজলেই কোমলমতী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ি ফেরার একটি তাড়না লক্ষ্য করা যায়। তাদের মধ্যে যাই যাই একট ভাব সৃষ্টি হয়। এতে করে ৩টার পরের পাঠগুলোতে তাদের মনযোগ থাকে না। তাছাড়া শিক্ষকরা যেমন তেমন, শিশু শিক্ষার্থীরা সকাল ৯টায় সকলে উপস্থিত হতে পারে না। শিক্ষকরা ঐ সময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্তমান সময়ের বিদ্যালয়ের সময়সূচির কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক মানসিক বৃদ্ধির অন্তরায়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচির কারণে বিদ্যালয়গামী কোমলমতি ও অবুঝ শিশুরা খেলাধূলা ও মুক্তভাবে বিচরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যা মোটেই কাম্য নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হয় প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টা। অপরদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হয় মাত্র ছয় ঘন্টা। কলেজের শিক্ষার্থীদের তো ধরা বাঁধা তেমন কোন নিয়ম মেনে চলতে হয়না। অনেক কলেজে তো বিকাল ৩টার মধ্যে ক্লাস শেষ হয়ে যায়। যাদের ধারণ ক্ষমতা কম সেই অবুঝ শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হবে দীর্ঘ সময়! আবার যাদের ধারণ ক্ষমতা বেশি তাদেরকে বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হবে কম সময়-এটা আবার কোন বিবেকে, কেমন করে? আসলে আমাদের বিদ্যালয়ের সময়সূচিতে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে সকাল ৯টার পূর্বে অবশ্যই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে হবে। কিন্তু এ সময়ে এসব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারে না। এ নির্ধারিত সময়ে সিংহভাগ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে। ফলে শিক্ষকগণ নির্ধারিত সময় পাঠদান শুরু করতে পারেন না। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে দেরিতে উপস্থিতির কারণ হচ্ছে-বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সারাদেশে চলমান আছে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্প।কাজেই শিশুরা ঘুম থেকে উঠে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মসজিদে চলে যায়। মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরে গোসল-খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিদ্যালয়ে যেতে দেরি হয়ে যায়। আর এরূপ দেরি হওয়া তো স্বাভাবিক। প্রাথমিক শিক্ষার দীপ্তি-উন্নত জীবনের ভিত্তি। সেই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিশুর শারীরিক ও মানসিকতার সাথে সঙ্গতি রেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচির প্রণয়ন করা অতি প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, শিশুদেরকে দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে চাপের মধ্যে রেখে কোন ধরণের বিকাশ সম্ভব হবে না। জানা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষকই বর্তমান সময় সূচী পরিবর্তন করে সকাল ১০.০০ টা থেকে ৩.০০ টা পর্যন্ত কার্যকর করার পক্ষে মতামত প্রদান করেছেন। একজন ( নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) শিক্ষক বলেন, কিযে বলেন ভাই! আমাদের কথা কি কেউ শুনবে? সময় সূচী পরিবর্তন করলে তো ভালই হতো। একজন শিক্ষককে প্রতিদিন ৬/৭টা করে ক্লাশ নিতে হয়। একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন এই পরিমান ক্লাশ নেয় তাহলে শিক্ষকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরতে হয়। আবার শব্দ দূষণ তো আছেই। শব্দ দূষনের তিনটি প্রধান উৎস এর মধ্যে প্রাইমারী স্কুল টিচিং অন্যতম। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে, শিক্ষক, শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বেড়েছে কয়েকগুন। তবে শিক্ষকের যে মান মর্যাদা বাড়েনি এটা ঠিক। শিক্ষিতের হার বেড়েছ, স্বাক্ষরতার হারও বেড়েছে। বহির্বিশ্বে আমাদের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। আমরা অ্যাওয়ার্ড ও পাচ্ছি। একুশ শতকের চ্যালেন্জ মোকাবিলায় শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে যাতে করে পরবর্তী প্রজন্মের কান্ডারিরা শিক্ষকতা পেশাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। এই মহৎ কাজ করতে গিয়ে পিছুটান আসবেই তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এখন আসুন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময় সুচি কার স্বার্থে ,কেন পরিবর্তন করা যেতে পারে? ১। দেশের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকতে হয়, -ফলে তারা দুপুরে ঘুমাতে পারে না। এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের সময়সূচী ১০.০০টা থেকে ৩.০০ টা পর্যন্ত কার্যকরী করা প্রয়োজন। ২। . রক্তে মাংসে গড়া একজন প্রাথমিকের শিক্ষক শিক্ষিত জাতি বিনির্মানের প্রথম কারিগর- যাঁদেরকে রিলাক্সে রাখাও আমার, আপনার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। রিলাক্স বলতে একজন শিক্ষক কে দিয়ে দৈনিক ৬/৭ টি ক্লাশ না নিয়ে, ক্লাশের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে সময় সূচী ১০.০০ টা থেকে ৩.০০ পর্যন্ত করা যেতে পারে। সেইসঙ্গে তাদের ক্লাশ বহির্ভূত কাজ তো আছেই। ক্লাশ কমানোর ক্ষেত্রে অবশ্য ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা হিসাবে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ালেও বাড়ানো যেতে পারে। তাছাড়া আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার বেশিরভাগ শিক্ষ মহিলা।যাদেরকে শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি স্বামী,সন্তান,শ্বশুর-শ্বাশুড়ী,সর্বোপরি সংসার সামলাতে হয়।তারাতো আপনার আমারাই বোন,কন্য,স্ত্রী..!!কাজেই এ বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটু ভেবে দেখা দরকার নয় কী? ৩। বিদ্যালয়ের সময়সূচী ১০.০০ টা থেকে ৩.০০ টা পর্যন্ত করা হলে -শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই ক্লান্তি ও অবসাদ গ্রস্ত হবে না। একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন বিরতিহীন বা একটানা ৬/৭ টি ক্লাশ করেন। তাহলে অঘোষিত ক্ষতি শিক্ষার্থীদেরই ভোগ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক প্রথম, দ্বিতীয় ক্লাশটি হয়ত রিলাক্সের সহিত ফলদায়ক বা কার্যকরীভাবে নিতে পারেন কিন্তু পরবর্তী ক্লাশ গুলো হয় দায়সারা প্রকৃতির। শিক্ষক হিসেবে তিনি যতই দায়িত্বশীল হউক না কেন তিনি তো রোবট নন।, তাঁরা তো রক্তে মাংসেই গড়া। জকিগন্জ উপজেলার দীপ্তি বিশ্বাস যে ক্লাশে ঘুমিয়েছিলেন, তা ক্লান্তি ও অবসাদের জন্য তো বটেই,আর সেটাকে নিয়ে কতিপয় মানুষ কিনা লোক দেখাদেখি করে প্রাথমিক শিক্ষকদের হাসির খোরাক বানালো।শুধু দিপ্তি বিশ্বাসই নন, এ রকম অনেক শিক্ষক আছেন, যারা বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবস্হানের কারনে ও “ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভূ “-এ ধরনের বা প্রাকৃতিক কারনে এখনও মাঝে মাঝে অনেক শিক্ষক ক্লাশেই ঝিমায় বা ঝিমাচ্ছে। এর কি কোন সমাধান আছে? এটা তো প্রাকৃতিক কারন! বলছিলাম না? তাঁরা তো রোবট নয়, রক্তে মাংসে গড়া মাটির মানুষ। এমতাবস্থায় বিদ্যালয়ে শিশুদের আটকে রেখে তেমন লাভ হয় না। তাই কর্তৃপক্ষের নিকট আকুল আবেদন বিদ্যালয় সময়সূচি পরিবর্তন করে সকাল ১০ টা হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত করার জন্য বিনীত ভাবে আবেদন করছি।মনে রাখতে হবে,“চাপ দিয়ে কাজ আদায় হয়না, কাজ সফল ও পুরোপুরি আদায় করতে হলে কর্মীদের মনের আকুতি বুঝতে হবে”।